এনেস্থেশিয়ার গল্প ১
আইসিইউ এর বারান্দায়
দাঁড়িয়ে রুপামনির মা। সামনের দরজা খুলে ইচ্ছে করলেই ভিতরে যাওয়া যায়! ডাক্তারের অনুমতি
আছে, কিন্তু রুপামনির সামনে দাঁড়ানোর কোনো ক্ষমতা নেই মায়ের। এতক্ষণ বাসায় থাকার কথা
ছিল, অথচ মেয়েটা রয়েছে আইসিইউ তে। নিজেক ছাড়া দোষ দেওয়ার মত কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না।
তাঁর চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে! খোলা চোখে দেখছেন না কিছুই!
অথচ আজকের দিন টা শুরু
হয়েছিল খুব মজা করেই। বাবার ছুটি, মেয়ের দাঁত তুলতে তাই বাবাও সাথে যাবেন। রুপামনি
গতকাল থেকে কতবার যে নিজের দাঁত ধরে দেখেছে। আচ্ছা এই দাঁত টা না থাকলে ওখানে কি একটা
গর্ত হবে? একটু কি ব্যাথা লাগবে? বাবা বলেছেন, বাবা সারাক্ষণ ওর হাত ধরে থাকবেন। কি
মজা! কি মজা! কারণ বাবা তো প্রায় বাড়িতেই থাকেন না। খুব ব্যস্ত মানুষ!
রুপামনি মাকে জিজ্ঞেস
করেছিল “ আচ্ছা মা, দাঁত তুললে কি টুথ ফেইরি বালিশের নীচে টাকা রেখে যায়?” আমার বালিশের
নীচে কি রেখে যাবে পাঁচ টাকার অনেকগুলো চকচকে কয়েন ? বলনা, মা বলনা! মা জানেন রুপা এটা জেনেছে তাঁর কাজিন প্রমিতার কাছে
থেকে। কানাডায় থাকে ওরা। ওখানে যে কোন বাচ্চার দাঁত পড়লে সেটা তারা বালিশের নীচে রেখে
দেয়। বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে নাকি তাদের ঘরে এসে টুথ ফেইরি সেই দাঁত নিয়ে যায়, বিনিময়ে
রেখে যায় চকচকে পয়সা। যেবার প্রমিতার দাঁত তোলা হোল, সেবার ভোর রাতে প্রমিতা একটা টুনি
(দুই ডলারের কয়েন) পেয়েছিল বালিশের নীচে।
বাবা সকালে দুবার খোঁজ
নিলেন। রুপা রেডি কি না? রুপা সেই ভোরবেলা থেকে উঠে বসে আছে। হাসপাতালে যেত হবে সকাল
আটটায়। অপারেশন দশটায়! ফিরতে ফিরতে কমপক্ষে দুটো তো বাজবেই। মা বুদ্ধি করে ভোরবেলা
রুপামনিকে এক গ্লাস দুধ খাইয়ে দিয়েছেন। এই এক রত্তি মেয়েটা কি অতক্ষণ না খেয়ে থাকতে
পারে?
মহা সমারোহে গাড়িতে করে
সবাই মিলে হাসপাতালে যাওয়া হোল। একটা খুব ইয়াং ধরনের ডাক্তার এলেন রুপামনির কাছে। উনি
নাকি এন্স না এন্থ না কি একটার ডাক্তার। নামটা বলতেই পারল না রুপামনি। পরে মা বললেন
যে ওটা হবে এনেস্থেটিস্ট। কি খটমটে নাম। একটু সহজ করে বুঝি রাখা যায় না? আর কি সব প্রশ্ন
যে জিজ্ঞেস করলেন! এর আগে কেউ এসব জিজ্ঞেস করেনি।
“আগে কোনদিন অপারেশন
হয়েছে?”
“বা! ছয় বছর বয়সে কয়জনের
অপারেশান হয়?” চটপটে জবাব রুপামনির।
কোন এলারজি আছে? রুপামনি
মুচকি হাসিতে বলে, “টিচারের কাছে পড়ায়!” মা চোখ পাকান, বাবা এই ইঁচড়ে পাকামি দেখে মজা
পান।
“আজ কিছু খাওনি তো?” রুপামনি কিছু বলার আগেই মা বললেন, “ওইটুকুন মেয়েটা
সকাল থেকেই না খেয়ে আছে। ” মায়ের বড় বড় চোখ দেখে রুপামনি কিছু বলে না। শুধু ভাবে, তখন
তো জোর করে খাওয়ালো, এখন কেমন চেপে যাচ্ছে?
তারপরে রুপামনিকে ভিতরে
নিয়ে যাওয়া হোল। বাইরের কাপড় বদলে ওকে একটা গাউন পরানো হোল। সাইজটা ওর মতোই তবে কি
রঙের বাহার! রং দেখে হেসেই বাঁচে না রুপা মনি।
মা আর বাবা বাইরে আছেন।
ডাক্তার বলেছেন অপারেশনে সময় লাগবে আধা ঘণ্টা, তারপরে একটু সেটল করলেই মা ভেতরে যেতে
পারবেন। বাবা যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু একজন যেতে পারবেন শুনে বললেন, “তা হলে তোমার মা
ই আগে যাক!”
একটু পরেই হঠাৎ দাঁতের
ডাক্তার খুব বিমর্ষ মুখে বেরিয়ে এলেন। এত দ্রুত তাকে দেখে মায়ের বুকটা কেমন জেন কেঁপে
উঠল অজানা আশঙ্কায়!
ডাক্তার বললেন, আপনার
মেয়ে কি সত্যিই কিছু খায়নি সকালে?
বাবা তাকালেন মায়ের দিকে,
মা তাকিয়ে মেঝের দিকে। বললেন, খুব ভোরে একটু দুধ খেয়েছিল। একেবারে একটু খানি। ও তো
দুধ খেতেই চায় না!
ডাক্তার চেহারায় বিস্ময়
ফুটিয়ে বললেন, আপনাদের সাথে এনেস্থেশিয়ার ডাক্তার সাহেবের কথা হয়নি গতকাল? মা মাথা
নাড়েন। না।
আপনারা জানতেন না যে
এনেস্থেশিয়া দিতে হলে খালি পেটে থাকতে হয় রোগীকে? না হলে বিপদের সম্ভাবনা থাকে?
মা বাবা দুজনেই নিরুত্তর
থাকেন। বাবা অস্থির ভাবে জিজ্ঞেস করেন, “ এসব কেন জিজ্ঞেস করছেন?” রুপামনি ঠিক আছে
তো?
ডাক্তার সাহেব বাবাকে
বসতে বলেন।
“আপনার মেয়ের সকালের
দুধ খাবার পর পাকস্থলী শূন্য হয়নি। দুধ জাতীয় খাবার পাকস্থলী থেকে বেরিয়ে যেতে কমপক্ষে
ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। আর যে খাবার পাকস্থলিতে থাকে, এনেস্থেশিয়ার ওষুধ দিলে অনেক সময়
তা মুখে চলে আসে, তাঁর কিছু অংশ চলে যেতে পারে ফুসফুসে। সেটাই ঘটেছে আপনার মেয়ের বেলায়,
কিছু খাওয়ার চলে গিয়েছে ওর ফুসফুসে। ওর শ্বাস প্রশ্বাস ভেন্টিলেটরের (কৃত্রিম ভাবে
শ্বাস প্রশ্বাস দেওয়ার যন্ত্র বিশেষ) মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। আমরা ওকে আইসিইউতে নিয়ে
যাচ্ছি।”
মা ডুকরে কেঁদে উঠেন,
বাবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন ওটির দরজার দিকে।
এটি একটি কাল্পনিক গল্প।
কিন্তু এমন ঘটনা ঘটেছে অসংখ্য বার। যে কোন অপারেশনের আগে (সম্ভব হলে অপারেশনের আগের
দিন) কথা বলুন আপনার এনেস্থেটিস্টের সাথে। আপনার যে কোন রোগের সম্পূর্ণ এবং সত্য বিবরণ
দিন। আগে অপারেশন হয়ে থাকলে সেখানে কোন সমস্যা হয়ে থাকলে সেটা বলুন। কোন ওষুধ খাওয়া
যাবে আর কোনটা বন্ধ করতে হবে তার তালিকা জেনে নিন। একজন প্রথিতযশা সার্জন যেমন প্রয়োজন
নিখুঁত সার্জারির জন্য, তেমনি একজন বিশেষজ্ঞ এনেস্থেটিস্ট প্রয়োজন আপনার নিরাপদ এনেস্থেশিয়ার
জন্য। সেটি আপনি নীরোগ এবং স্বাস্থ্যবান হলেও। আপনিই ঠিক করুন আপানর বা প্রিয়জনের জীবনের/অঙ্গহানির
বা দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার মূল্য কত?
এনেস্থেশিয়ার আগে না খাওয়ার নিয়মাবলি:
যে কোন অপারেশনের আগে
কম পক্ষে ৮ ঘণ্টা পেট খালি রাখা (যেমন রাতের বা দুপুরের খাবার খাওয়ার পর) ।
হাল্কা খাবারের ক্ষেত্রে
না খাওয়ার সময় কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা । হাল্কা খাবার যেমন, দুধ, সিরিয়াল, ফল,। দুধ সহ কফি
বা চা এই দলে পড়ে।
পানীয় কমপক্ষে ৪ ঘণ্টা
আগে। ভেতরে কোন দানা নেই এমন ধরনের যে কোন পানীয়। যে কোন জুস, ব্ল্যাক কফি বা চা, অথবা প্রচলিত শীতল পানীয়।
২ ঘণ্টা আগে পর্যন্ত
পান করা যাবে শুধু পানি, অথবা যে পানীয়ের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায় এমন পানীয়, যেমন
স্প্রাইট। দ্বিধা এড়ানোর ভাল উপায় অন্তত চার ঘণ্টা কোন পানীয় পান না করা। শিশুদের জন্য
২ ঘণ্টার নিয়মাবলী কারণ কোন কোন শিশুর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যেতে পারে বেশিক্ষণ
অনাহারে থাকলে। অথবা হতে পারে পানিশূন্যতা
ওপরের নিয়মগুলি সধারন
নিয়ম। কিছু ক্ষেত্রে এই সময় আরও লম্বা, যেমন
গর্ভবতী নারী, পেটের পীড়ায় আক্রান্ত রোগী, যে রোগীর অত্যাধিক ওজন ইত্যাদি।
আপনার অপারেশনের আগে
অবশ্যই কথা বলুন আপনার এনেস্থেটিস্টের সাথে। আপনার মঙ্গলের জন্যেই।
যে কোন এনেস্থেশিয়া সঙ্ক্রান্ত
প্রশ্ন করতে পারেন ফেসবুকেঃ bdemr.com এর পেইজে।
No comments:
Post a Comment