রহমান সাহেবের হার্টের অসুখ। বাড়িতে সবাই খুব চিন্তিত। রহমান সাহেবের স্ত্রী বুঝতে পরছেন না কার সাথে পরামর্শ করবেন। তাঁর বড় ছেলে রহিমের এক সহপাঠী ডাক্তার , তাকেই ডেকে এনেছেন তিনি। ছেলেটা বেশ চটপটে। কগজপত্র দেখে বলল তাঁর পরিচিত হসপিটালে অপারেশন করানো যাবে। খরচের ব্যাপারে যত টুকু কম করা যায় সে চেষ্টা করবে। তবে একজন নাম করা সার্জন কে দিয়ে যেহেতু অপারেশন করান হবে , তাই তার ফি কম হবে না। হাসপাতাল পরিচিত ডাক্তারের সুবাদে কিছু টাকা কম করবে।
রহমান সাহেবের স্ত্রী নিশ্চিন্ত বোধ করেন যে হার্টের মত জটিল বিষয়ে একজন নাম করা সার্জন অপারেশন করবেন। তিনি তাঁর স্বামীর চিকিৎসায় কোন ত্রুটি রাখবেন না। দ্রুত মনস্থির করেই খবর দেন সেই তরুণ চিকিৎসকে। রহমান সাহেব ভর্তি হয়ে যান হাসপাতালে।
হাস্পাতলের ব্যবস্থা দেখে দেখে খুশি হন দুজনেই । রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, আর একো পরীক্ষা হোলো দ্রুততার সাথে । পরের দিন সকাল বেলায় অপারেশনের সময় ঠিক হোলো। রাতের দিকে একজন ডাক্তার এলেন। এসেই দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ঢাকার জ্যামে আটকে পরায় তাঁর দেরি হয়েছে আসতে।
চিকিৎসক মমতা ভরা মুখে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন কেমন আছেন, রহমান সাহেব ?"
রহমান সাহেব শারীরিক ভালই আছেন। তবে তাঁর মুখে হাসি নেই। আগামীকালের অপারেশন নিয়ে তাঁর কিছু চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মাথায়। তিনি বেঁচে ফিরবেন তো ?
তিনি উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, "আমি বাঁচব তো ডাক্তার সাহেব?"
প্রশ্নটা শুনে সেই চিকিৎসক হাসলেন না। রহমান সাহেবের হাত ধরে বললেন, "চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে, এনেস্থেসিয়া এবং অপারেশনের পরে মৃত্যুর হার অনেক কমেছে আগের তুলনায়। এনেস্থেশিয়া এবং সার্জারি আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ। অপারেশনের সময় এবং পরে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্যে যন্ত্রপাতি আছে। সেগুলো ঠিক মত ব্যবহার করলে অনেক জটিলতা এড়ানো যায় বা দ্রুত সনাক্ত করা যায়।
"সেসব যন্ত্রপাতি আছে তো এই হাসপাতালে? "
"দেশের সব বড় হাসপাতালেই আছে এসব যন্ত্র। যেখানে হার্টের অপারেশন হয়, সেখানেএগুলো থাকতেই হয়। এখানেও আছে। "
ডাক্তারের কথায় একটু নিশ্চিত বোধ করেন রহমান সাহেব।
' আপনার ইতিহাস শুনি একটু"
প্রশ্ন শুনে থতমত খেয়ে যান রহমান সাহেব। "ইতিহাস মানে?"
"আপনার স্বাস্থ্য সঙ্ক্রান্ত ইতিহাস। কোন রোগ আছে কিনা? কোন ওষুধ খান কিনা? জানা কোন অ্যালার্জি আছে কিনা।পরিবারে কারও এনেস্থেশিয়াতে কোন জটিলতা হয়েছিল কিনা? "
"ব্লাড প্রেশার দেখে এক ডাক্তার সাহেব ওষুধ দিয়েছিলেন, কিছুদিন খেয়ে আর খাইনি। তেমন অসুবিধা হয় না। আজ তিন বছর। এবার ই হঠাৎ করেই বুকে ব্যাথা হোল। ডাক্তার সাহেব বললেন হার্টে ব্লক। রিং পরানোর সুযোগ নেই। অপারেশন করতে হবে। "
"আপনার শ্বাসকষ্ট হয়? "
"না, তবে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে হাঁপিয়ে যাই"
"রাতে শোয়ার সময় কয়টা বালিশ লাগে?"
"আগে একটা বালিশে শুতে পারতাম , এখন দুটো তিনটে লাগে, তা এসব প্রশ্ন করছেন কেন? "
এগুলো হার্ট ফেইলরের লক্ষণ।
"আমার হার্ট ফেল করেছে, তাও আমি বেঁচে আছি? " ভয়ার্ত মুখে জিজ্ঞেস করেন রহমান সাহেব। কাঁদো কাঁদো হয়ে যান তাঁর স্ত্রী।
"হার্ট ফেল করা মানে হার্ট ঠিক আগের মত শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পাম্প করতে পারে না। হার্ট ফেল মানে হার্ট বন্ধ হওয়ে যাওয়া নয়। আপনার অবস্থা জানা থাকলে আপনাকে অজ্ঞান করার সময় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হবে।"
"অজ্ঞানের ডাক্তারের সাথে একবার কথা বলা যায় না? "
"আমিই আপনার এনেস্থেটিস্ট"
" আপনারা অপারেশনের আগে রোগীর সাথ দেখা করেন? আগে কখন শুনিনি।
"সব অপারেশনের জন্যেই রোগীর সাথে একজন এনেস্থেটিস্টের দেখা হওয়া খুব প্রয়োজন। এমনকি একেবারে সুস্থ রোগীর জন্যও। রোগী সম্পর্কে সম্পূর্ণ না জানলে যে কোন জটিলতা দেখা দিলে তাঁর নিরাময় মুস্কিল হতে পারে। সমস্ত হার্ট অপারেশনের আগে একজন এনেস্থেটিস্ট রোগীর সমস্ত ইতিহাস জেনে নেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ফলাফল দেখেন। তারপরে ঠিক হয় তিনি কিভাবে এনেস্থেশিয়া দেবেন।
"যাক আপনার সাথে দেখা হয়ে এখন আমি খুব স্বস্তি বোধ করছি। কাল তাহলে সকালে আপনিই থাকবেন তো?"
"হ্যাঁ, আমি থাকব। আপনি জেগে থাকা অবস্থায় আপনার হাতে দুটো কানুলা দিতে হবে। একটি আপনার ওষুধ দেওয়ার জন্য। অন্যটি আপনার সার্বক্ষণিক ব্লাড প্রেশার দেখার জন্য। এরপরে ওষুধ দিয়ে আপনাকে ঘুম পারিয়ে দেওয়া হবে। আইসিইউ তে নিয়ে যাওয়ার পরে আপনার ঘুম ভাঙবে। আপনি নিজে শ্বাস নেওয়ার মত সুস্থ হলেই শ্বাসপ্রশ্বাসের নল খুলে দেওয়া হবে। এই সময় আরও অনেক মনিটর লাগানো থাকবে। সেগুলো সময় মত খুলে দেওয়া হবে।
"আচ্ছা, আমাকে ঘুমে পারিয়ে দেওয়ার পর আপনি আবার ঘুম ভাঙ্গাতে আসবেন তো ঠিক সময়ে?" সন্দেহের চোখে তাকান রহমান সাহেব।
"একজন এন্সথেটিস্ট এনেস্থেসিয়ার শুরু থেকে একদম শেষ পর্যন্ত রোগীর সাথেই থাকেন, সার্বক্ষণিক। এনেস্থেটিস্টের মুহূর্তে অনুপস্থিতিতে বিপদের সম্ভাবনা থাকে। "
"আমার বুকের ভেতর থেকে পাষাণ ভার নেমে গেল। আপনার সাথে কথা বলে খুব ভাল লাগল। আশা করি সব এনেস্থেটিস্ট যেন আপনার মত হয়। "
'আপনারা যদি সবাই এনেস্থেটিস্টদের সাথে কথা বলেন , প্রয়োজনে ফোন করে , তাহলে সবার জন্য মঙ্গল। ভাল থাকবেন, কাল আবার দেখা হবে, "ইনশাল্লাহ।"
"ইনশাল্লাহ"
No comments:
Post a Comment