রঞ্জনের আজকের দিন
টা ভাল যাচ্ছে
না। ভাল যে যাবে
না তা
ও জানত। সাত সকালে
উঠে যদি দাড়ি
কাটতে গিয়ে গাল
কেটে যায়, ইস্ত্রি
করা শার্টের একেবারে
বুকের কাছে একটা
বোতাম হাওয়া হয়ে
থাকে, আর রাস্তায় রিকশাওয়ালা দাঁত কেলিয়ে ২০
টাকার ভাড়া ৩০
টাকা হাঁকে,
তবে দিন
টা কোনভাবেই ভাল যেতে পারে
না।
ও এনেস্থেসিয়া বিভাগে কাজ করে। ঢাকার
এক নাম করা
বেসরকারি হাসপাতালে। কাজের চাপ
মোটামুটি, বেতনটা ভাল। ওর ট্রেনিং
শেষ। খুব দ্রুত বিশেষজ্ঞ
হিসেবে পোস্টিং হবে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে
রঞ্জন। চোখে তার অনেক
স্বপ্ন, আর মাথা
ভর্তি পরিকল্পনা। ওর শর্টলিস্টে আছে, একটা ভাল
বাসা, একটু ভালবাসা
, আর আরেকটু ভাল
থাকার মত বেতন।
সকালে ওটিতে ঢুকতেই
ওটি ইনচার্জ বাসনাদি বললেন, "মান্নান সার সিজার
ওটিতে। কোন এক ভিআইপি
পেশেন্টের সিজার হচ্ছে। তাই
সারকে সকালে আসতে
হয়েছে। স্যারের মেজাজ খারাপ।শিগগির সিজার ওটিতে
যান।" রঞ্জন কোনওরকমে ওটির ড্রেস পরেই
একতলায় সিজার ওটিতে
দৌড়ায়। মান্নান স্যার বিভাগীয়
প্রধান, এত সকালে
ওটি তে আসা
পছন্দ করেন না। তার
বয়স হয়েছে, তরুণ ছেলে ছোকরারা
এখন সব এনেস্থেসিয়া সামাল দিতে পারে। কিন্তু
ভিআইপি অনুরোধ ফেলা
যায় না। চাকরী বলে কথা। ওটিতে ঢুকতেই
দেখে মান্নান স্যার দরজায় দাঁড়িয়ে।
"ও রঞ্জন! তুমি
ছাড়া তো এত
সকালে ওটিতে কেউ
আসে না। এদিকে ঘর
ভর্তি লোক! এটা
কি মাছের বাজার
মনে করে নাকি
সবাই। তুমি একটু দেখো!"
গজগজ করতে থাকেন
মান্নান সার!
"জী" বলেই রঞ্জন
ঢুকে যায় ওটিতে। ও
মা! এ যে
লোকে লোকারণ্য। অন্তত চারজন
বাইরের লোক। ওটির নাসিং স্টাফ আর সার্জারি টিম তো আছেই। হাসপাতালের পরিচালক আর চেয়ারম্যান সাহেবকে চেনা যাচ্ছে,
একজন নিশ্চয়ই মহিলার
স্বামী , আরেকজন
ওটির পোশাক পড়া
লোকটা যে কে?
রঞ্জনের জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে
ভদ্রলোক এগিয়ে আসেন। "আমি শিশু বিভাগের
নূতন সহকারী অধ্যাপক"
স্মিত হাস্যে বললেন
তিনি।
ওটি নার্স দুজন
এক কোনায় অপারেশন
ট্রলির সমস্ত ইন্সট্রুমেন্ট গুনে গুনে মিলিয়ে
নিচ্ছে। ওরা এত লোক
দেখে একটু জড়সড়
হয়ে আছে। রঞ্জন জানে
এই মুহূর্তে সবচাইতে বড় সাহায্য
আসবে রোগীর স্বামীর
কাছে থেকে। ও এগিয়ে
যায় ওটি টেবিলের
কাছে মহিলার ফাইল
হাতে নিয়ে। "আমি
ডাক্তার রঞ্জন। আজ আমি
আপনার এনেস্থেটিস্ট। আমি আপনাকে
কিছু প্রশ্ন জিগ্যেস
করব। আমার মনে হয়
সবার সামনে আপনার
ব্যক্তিগত তথ্য জিজ্ঞেস
করা ঠিক হবে
না।"
হাসপাতালের পরিচালক মহোদয়
বুঝতে পারেন যে
তাদের উপস্থিতির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তিনি চেয়ারম্যান সাহেবকে অনুরোধ করেন,
"স্যার, চলেন আমার
অফিসে যাই, ডাক্তারেরা ওদের কাজ করুক"
"ডাক্তার সাহেব, উনি
আমার আত্মীয়। দেখেবন চিকিৎসার
যেন কোন ত্রুটি
না হয়!" চেয়ারম্যান সাহেব বলেন
রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে।
রঞ্জন মাথা নাড়ে,
"জী সার"
ও কখনো বুঝতে
পারে না এরা
ডাক্তারদের কি মনে
করেন। এরকম তদবিরের কেউ
না থাকলে কি
তার চিকিৎসায় ডাক্তারেরা অবহেলা করবেন?
না কি তদবির
করলে চিকিৎসা পালটে
দেবেন?
বিশাল বাহিনী বেরিয়ে
গেলে অপারেশন থিয়েটারে
খানিকটা নিস্তব্ধতা নামে।
রঞ্জন দ্রুত কথা
সেরে স্পাইনাল দিয়ে দেয়।
ওবি গাইনি বিশেষজ্ঞ
বিউটি আপা চমৎকার
অপারেশন করেন। তার হাত
নিখুঁত। সময়ও লাগে কম। ওটিতে
নার্স ও এনেস্থেটিস্টদের মধ্যে বেশ
জনপ্রিয়। প্রায় ২৫ মিনিটেই
অপেরাশন শেষ হয়ে
যায়।
রোগীকে পোস্ট অপারেটিভ
ওয়ার্ডে দিয়ে স্বস্তির
নিশ্বাস ফেলে রঞ্জন। এই
সব ভিআইপি কেস
শেষ না হওয়া
পর্যন্ত টেনশান যায়
না।
বের হতেই দেখে
সেই শিশু অধ্যাপক। বড়
ওটি তিন তলায়,
শিশু বিভাগ দোতলায়। উনার
সাথেই রওয়ানা দেয়
দোতলার দিকে। হঠাৎ তারস্বরে
এলারম বেজে উঠে
। শিশু ওয়ার্ড,
কোড ব্লু। শিশু ওয়ার্ড,
কোড ব্লু।
রঞ্জন কথা শেষ
না করেই দৌড়
দেয় শিশু ওয়ার্ডের
দিকে।
৭ বছরের শিশু। ডায়ারিয়া
নিয়ে ভরতি হয়েছিল।চিকিৎসায় সুস্থ্য হয়ে
গিয়েছিল। ডাক্তার ছেড়ে দিয়েছেন
আজ সকালে।
শিশুটির হাত থেকে
স্যালাইনের জন্য দেওয়া
নল খুলে নেওয়ার
আগে একটু স্যালাইন
পুশ করে সব
কিছু ঠিক আছে
কিনা দেখে নিতে
চেয়েছিল নার্স। তখনি শিশুটি
অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
কার্ডিয়াক মেসেজ চলছে। রঞ্জন
খুঁজে দেখে আসলে
কি ওষুধ দেওয়া
হয়েছে। নার্স যা দেখাল
তা দেখে রঞ্জনের
মাথায় হাত।
নার্স স্যালাইন দিতে যেয়ে ভুলে
পটাসিয়াম ক্লোরাইড দিয়ে ফেলেছে। আর তাতেই
শিশুটির হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে। শরীরে
পটাসিয়াম বেশি হয়ে
গেলে হার্ট ঠিকমত
পাম্প করতে পারেনা,
অবস্থা হয় একটা
বলের মত কিন্তু
সামান্যতম সঙ্কোচনের ক্ষমতা থাকে না। এই
অবস্থার নাম ভেন্ট্রিকুলার ফিব্রিলেশান। তৎক্ষণাৎ
চিকিৎসা না হলে
রোগী শেষ।
রঞ্জন নিজেকে প্রবোধ
দেয়, অন্তত আমরা
কারণ টা জানি।
দ্রুত কিছু ওষুধ
দিতে নির্দেশ দেয়। ও
কারডিয়াক এরেস্ট টিমের
লিডার। প্রায় আধা ঘণ্টা
চেষ্টার পর হৃৎস্পন্দন শুরু হয় শিশুটির। ঘেমে
নেয়ে একাকার গোটা
টিম। কিন্তু মুখে হাসি
ফুটে উঠে সবার। চিকিৎসকের হাতে ক্ষতির (iatrogenic injury) হাত থেকে, নিশ্চিত
মৃত্যুর হাত থেকে,
বাঁচানো গেল শিশুটিকে। শিশুটিকে
আইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার
সিদ্ধান্ত হয়।
রঞ্জন যখন বাইরে
বেড়িয়ে এলো সেখানে
তখন শুধু থেমে
থেমে কান্নার শব্দ। শিশুটির
আত্মীয় স্বজনেরা ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছেন। একজন
পুরুষ চিৎকার করছিলেন
তিনি ডাক্তারদের দেখে নেবেন, হাসপাতাল
বন্ধ করে দেবেন,
কোর্টে কেস করবেন,
এসব। এই সব খুব
সাধারণ ঘটনা। প্রতিনিয়ত ডাক্তারেরা মার খায়,
কিন্তু তাদের পরিশ্রম,
তাদের সেবা মানুষের
চোখে পড়ে না।
একজন, সম্ভবত শিশুটির
বাবা, জিজ্ঞাসু মুখে এগিয়ে এলেন। চোখে
আশার আলো দেখা
যাচ্ছে না।
রঞ্জন মৃদুকণ্ঠে বলে, "আপনার ছেলের
হৃৎস্পন্দন চালু হয়েছে। ওকে
আইসিইউতে নিয়ে যাচ্ছে। আপাতত
বিপদমুক্ত। তবে ওর জ্ঞান
সম্পূর্ণ না ফেরা
পর্যন্ত , এবং
আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা
না করা পর্যন্ত
কোন ক্ষতি হয়েছে
কিনা বলা যাবে
না। আপনারা একজন একজন
করে দেখে আসতে
পারেন, তবে প্লিজ
বাবা মা ছাড়া
কেউ যাবেন না,
এই সময় বেশি
মানুষের যাতায়াত রোগীর
জন্য ভাল নয়।"
বাবা আর মা
একসাথে ছুটে যান
কেবিনের দিকে।
রঞ্জন ক্লান্ত পায়ে
চলে যায় ওটির
দিকে। দেড়ি হয়ে গেছে
অনেক। সার্জন বসে আছেন।সামনে পরে আছে সারাদিনের সব অপারেশান।
কেউ একবার ধন্যবাদ
পর্যন্ত বলে না।
কোড ব্লু মানে
কি? ( কোন
রোগী সংজ্ঞা হারিয়ে
ফেললে অথবা হার্টের
স্পন্দন বন্ধ হয়ে
গেলে তরিৎ চিকিৎসার
জন্য এই ঘোষণা
দেয়া হয় সুইচ
বোর্ডের মাধ্যমে। আগে থেকেই
ঠিক করা এক
দল চিকিৎসক তাদের
কাজ ফেলে রোগীর
পাশে যেয়ে হাজির
হন।)
এরকম ভুলের প্রতিকার: প্রত্যেক ওষুধ দেওয়ার আগে
দুইজন নার্সের দেখে
নেওয়া উচিত। যে কোন
ওষুধ সিরিঞ্জে তুলে তাতে ওষুধের
নামের লেবেল লাগিয়ে
রাখা উচিত। স্যালাইনের মধ্যে কোন ওষুধ
দিলে সেই স্যালাইনের গায়ে ওষুধের
নাম লিখে লেবেল
লাগান উচিত। এনেস্থেসিয়া সঙ্ক্রান্ত যে কোন
প্রশ্ন করুন ফেসবুকে
bdemr.com পেইজে।
লেখক প্রবাসী চিকিৎসক। এনেস্থেসিয়া সঙ্ক্রান্ত যে কোন প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য প্রশ্ন করুন ফেসবুকে bdemr.com পেইজে.
No comments:
Post a Comment